মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের উচ্চ ইল্ডকে সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের স্থিতিশীল ও শক্তিশালী অর্থনীতির প্রতিফলন ধরা হয়, যা কিনা বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়। এ অবস্থায় ডলারের মান আরো শক্তিশালী হয়। কিন্তু এখন বন্ডের ইল্ড ও ডলারের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক (কোরিলেশন) ভেঙে পড়ছে। মূলত নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্থিরতার প্রতিক্রিয়া পড়েছে সামগ্রিক আর্থিক বাজারে। এতে মার্কিন সম্পদের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। খবর এফটি।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, মার্কিন সরকারি ঋণের ইল্ড ও মুদ্রার মান একসঙ্গে ওঠানামা করেছে। যেখানে বরাবরই বিদেশী মূলধন আকর্ষণ করেছে উচ্চ ইল্ড। কিন্তু এপ্রিলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’ ট্যারিফের পর সে প্রবণতা ভাঙনের মুখে পড়েছে।
উচ্চ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ঘোষণার পর গত দুই মাসে ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি ইল্ড ৪ দশমিক ১৬ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছে। একই সময়ে অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার কমেছে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে মে মাসে ডলার ও ইল্ডের মধ্যকার সম্পর্ক প্রায় তিন বছরের সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএসের জি১০ ফরেক্স স্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান শাহাব জালিনুস বলেন, ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে উচ্চ ইল্ড শক্তিশালী মার্কিন অর্থনীতির ইঙ্গিত দেয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রে মূলধন প্রবাহের জন্য আকর্ষণীয়।’
বর্তমান পরিস্থিতি উল্লেখ করে তিনি জানান, আর্থিক উদ্বেগ ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে মার্কিন ঋণ আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ কারণে ইল্ড বাড়ছে। আবার একই সঙ্গে ডলার দুর্বল হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের প্রবণতা সাধারণ উদীয়মান অর্থনীতিতে বেশি দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় একাধিকবার উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে গত মাসে ট্রাম্পের ‘বিগ, বিউটিফুল’ ট্যাক্স বিল এবং ঋণমান সংস্থা মুডি’স মার্কিন ক্রেডিট রেটিং ডাউনগ্রেড করায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি আরো বেড়েছে। এর চাপ পড়েছে মার্কিন বন্ডের ইল্ডে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান অ্যাপোলোর প্রধান অর্থনীতিবিদ টর্সটেন স্লকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে মার্কিন সরকারের ক্রেডিট ডিফল্ট সুইচ (সিডিএস) স্প্রেড এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা গ্রিস ও ইতালির মতো দুর্বল অর্থনীতির সঙ্গে তুলনীয়। সিডিএস স্প্রেড একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক—ঋণখেলাপির ঝুঁকি থেকে বাঁচতে বিনিয়োগকারীদের কী পরিমাণ খরচ করতে হচ্ছে, এটি তা নির্দেশ করে। যদি কোনো দেশ ঋণ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সিডিএস কিনে রাখা বিনিয়োগকারী ক্ষতিপূরণ পায়।
ক্ষমতা গ্রহণের আগে ও পরে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জে পাওয়েলকে উদ্দেশ করে একাধিকবার বাক্যবাণ ছুড়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এ আক্রমণ বাজারে আতঙ্ক তৈরি করেছে। এমনকি গত সপ্তাহে পাওয়েলকে হোয়াইট হাউজে ডেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি সুদহার না কমিয়ে ভুল করছেন।
সিটাডেল সিকিউরিটিজের গ্লোবাল রেটস ট্রেডিং বিভাগের প্রধান মাইকেল ডি পাস বলেন, ‘মার্কিন ডলার শক্তিশালী হওয়া বড় একটি কারণ হলো প্রতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা। এর মধ্যে রয়েছে আইনের শাসন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও পূর্বানুমানযোগ্য আর্থিক নীতি। এসবই ডলারকে রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।’
মাইকেল ডি পাসের মতে, গত তিন মাসে প্রতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতার এ চালকগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
গত কয়েক বছরের প্রবণতা থেকে বড় একটি পরিবর্তন নির্দেশ করে ট্রেজারি ইল্ড ও ডলারের মধ্যে সম্পর্কের বিচ্যুতি। আগে অর্থনীতির নানা দিক ও সুদহারের প্রবণতার ওপর নির্ভর করত সরকারি বন্ডের ইল্ড। কিন্তু এখন সে সম্পর্ক কাজ করছে না। নতুন এ প্রবণতা নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছেন, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করেন সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থা আমুন্ডির গ্লোবাল ফরেক্স প্রধান আন্দ্রেয়াস কোয়েনিগ।
তার মতে, গত কয়েক বছরে বিনিয়োগকারীরা যখন তাদের বিনিয়োগ তালিকায় ডলারকে সামনে রাখত। কারণ তারা মার্কিন মুদ্রাকে নির্ভরশীল ও স্থিতিশীল মনে করত। কিন্তু এখন যদি ডলারের মান ওঠানামা করে এবং অস্থির হয়ে পড়ে, তাহলে এর পরিবর্তনে বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়াবে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকরা শুক্রবার এক নোটে লেখেন, বিনিয়োগকারীরা এখন ভাবছেন ডলার ও ট্রেজারির ইল্ডের মতো সম্পদ শ্রেণীতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা। কারণ ফেডের স্বাধীনতা ও টেকসই আর্থিক নীতি নিয়ে সাম্প্রতিক উদ্বেগের মাঝে সম্পদের এসব ধরনের সম্পর্কে বদল এসেছে। এখন ডলার দুর্বল, ইল্ড বেশি ও পুঁজিবাজারে পতন এ তিনটি একসঙ্গে দেখা যাওয়ায় হেজ রেশিও বা বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানোর পুরনো কৌশলগুলো আর কাজ করছে না। অর্থাৎ, ডলার নির্ভর বিনিয়োগের বিপরীতে নিরাপত্তা নিতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করা হচ্ছে।
ইউবিএসের শাহাব জালিনুস বলেন, ‘নীতিগত অনিশ্চয়তা যত বাড়ে, বিনিয়োগকারীরা তত বেশি হেজ রেশিও বাড়ান। বিদ্যমান ডলার সম্পদের ওপর যদি হেজ রেশিও বাড়ানো হয়, তাহলে আপনি কয়েক বিলিয়ন ডলার বিক্রির কথা বলছেন।’
গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকদের পরামর্শ, বিশেষ করে ইউরো, ইয়েন ও সুইস ফ্রাংকের বিপরীতে ডলারের দুর্বলতার জন্য বিনিয়োগকারীদের প্রস্তুত থাকা উচিত। এ মুদ্রাগুলো সাম্প্রতিক মাসগুলোয় শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এছাড়া স্বর্ণে বিনিয়োগের পক্ষে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে।